
আসাদ মাহমুদ ও আলমগীর হোসেন:
হৃদয়ে স্বৈরাচার লালন ও মননে ফ্যাসিবাদ যিনি ধারণ করেন তিনিতো স্বৈরাচার আওয়ামী ঠিকাদারদের আর্থিকভাবে পূণ: বাসন করবেন-এটাই স্বাভাবিক। বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন আমুর পালিত পুত্র হিসেবে পরিচিত ফয়সাল আালম গত তিন বছর ধরে ফ্যাসিবাদকে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করে আসছেন সরকারি অফিসকে ব্যবহার করে। আমুর প্রভাবে প্রথমে ঝালকাঠি পরবর্তীতে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়ে এই গণপূর্ত কর্মকর্তা বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসা টেন্ডার বাণিজ্যসহ নির্মাণ মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ কাজগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দের মোটা অংকের অর্থ প্রতিবছর লোপাট করে আসছেন। অবৈধ উপায়ে আয়কৃত অর্থের একটি অংশ তিনি আ’লীগের বিতর্কিত একতরফা দ্বাদ্বশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পালিত বাবা আমির হোসেন আমু ও বিএনপি থেকে নৌকায় চড়ে বসা ব্যারিষ্টার শাহজাহান ওমরের নির্বাচনী কাজে ব্যয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বরিশালে স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-জনাতার আন্দোলন দমাতেও ছাত্রলীগের মাধ্যমে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন তিনি। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অতীতের ন্যায় তিনি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে আ’লীগ সমর্থক ঠিকাদারদের বেশীরভাগ কাজ পাইয়ে দিয়েছেন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আাশ্রয় নিয়ে। এরকম বহু প্রমাণ ‘বাঙালি সংবাদ’ এর হস্তগত হয়েছে। ১২৫৬৪২১নং ওটিএম টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেসার্স এস এ এন্টারপ্রাইজকে ১৮০০৯৬৫.০০০ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশালে গণপূর্ত বিভাগের PWD) আওতাধীন সরকারি কার্যালয়, বাসভবন এবং পরিদর্শন বাংলোগুলির এয়ার-কুলারের বার্ষিক সার্ভিসিং ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজটি পাইয়ে দেওয়া হয়। এস এ এন্টারপ্রাইজ এর মালিক ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও টুঙ্গিপাড়া নিবাসী দীন ইসলাম। তিনি জুলাই অদ্ভ্যুত্থানের পর থেকে পলাতক আছেন। অথচ তার প্রতিষ্ঠানের নামে এরকম বহু কাজ পাইয়ে দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে নিজেই করছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের সাথে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে নৌকা প্রতীকে জয়ী হন তিনি।
একইভাবে একই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১২৬৮৬৩৩নং ওটিএম টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ৮৮৭৭০২.৮২৬ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশাল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বরিশালের অন্যান্য ভবন ও কাঠামোর মেরামত, সংস্কার এবং বৈদ্যুতিক কাজ; ৩৮২১৩০.৮৪৭ টাকা চুক্তিমূল্যে ১১৪৫৬৯৯নং ওটিএম টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে একই প্রতিষ্ঠানকে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থিত দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষে টাইলস স্থাপন এবং এজলাস কক্ষ ও স্টেনোগ্রাফারের কক্ষের কাঠের আসবাবপত্রে বার্নিশ ও রং করার কাজ; ১১৪৫৬৪৩ আইডির ব্যবহার করে ৪৪৯০৩০.৫০২ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র সহকারী বিচারকের ব্যক্তিগত কক্ষের অভ্যন্তরীণ সজ্জা, আলোকসজ্জা এবং আনুষঙ্গিক বৈদ্যুতিক কাজ; ১১৪৪০৫৪ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ৮৬৩১১১.৮৪৪ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশাল জেলা জজ কোয়ার্টারের ফাল্গুনী ভবনের দ্বিতীয় তলায় সিভিল, স্যানিটারি ও আনুষঙ্গিক বৈদ্যুতিক কাজ; ১১৪২৬৫৬ নং টেন্ডার আইডি ব্যবহার করে ৫৯১২১৫.৯৫৮ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারকের ব্যক্তিগত কক্ষে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক কাজ; ১১৪৫২৫৬নং টেন্ডার আইডির মাধ্যমে ৬৩৩২৭৫.৮০২ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারকের ব্যক্তিগত কক্ষে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক কাজগুলো পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ১১৪৫২৫৬ ও ১১৪২৬৫৬নং টেন্ডার আইডি দুটোর কাজ একই জায়গায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারকের কক্ষে একই ধরণের দুইটি কাজের বাস্তবায়ন দেখিয়ে ৬৩৩২৭৫.৮০২+ ৫৯১২১৫.৯৫৮= ১২২৪৪৯১.৭৬ টাকার অনিয়ম করা হয়েছে। এই কাজের মাধ্যমে বরাদ্দে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আালম কোন ধরণের কাজ না করেই লোপাট করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।

স্বৈরাচার নেতা আমির হোসেন আমুর সাথে একান্ত আলাপ-চারিতায় প্রকৌশলী ফয়সাল আলম
এস এ এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে বাস্তাবয়নকৃত অন্যান্য কাজগুলোতেও ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দে বড় অংশ লুটপাট ভাগ-বাটোয়ারা করার অভিযোগ রয়েছে।
অপরদিকে, ওটিএম টেন্ডার আইডি নং ১২৩১৬০১ এর মাধ্যমে গোপালগঞ্জের প্রতিষ্ঠান মেসার্স সৌরভ ট্রেডার্স একই অর্থবছরে ২৯৪৪৬৩৩৩.৫৫১ চুক্তিমূল্যে গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, রংপুর, জামালপুর এবং যশোর জেলায় BITAC-এর ৬ (ছয়) কেন্দ্র স্থাপন (বরিশাল-এ একটি) উপ-প্রধান: আনুষঙ্গিক পণ্য সরবরাহ ও স্থাপন কাজটি পাইয়ে দেন লুটেরা নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটির মালিক একজন আওয়ামী নেতা বলে জানা গেছে।
টেন্ডার আইডি নং ১২৭৪৩৭৪ ব্যবহার করে বরিশালে সরকারি শিশু হাসপাতালের নির্মাণ কাজের অবশিষ্ট অংশ এর অন্তভূক্ত বিষয়সমূহ ১০০০ কেভিএ (KVA) সাব-স্টেশন সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপন; ৪০০ কেভিএ জরুরি জেনারেটর সরবরাহ ও স্থাপন; ২০ হর্সপাওয়ার (HP) সাবমার্সিবল পাম্প-মোটর সেট ও ১০ হর্সপাওয়ার সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প-মোটর সেট সরবরাহ ও স্থাপন; অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সরবরাহ ও স্থাপন; শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বজ্রপাত নিরোধক ও আর্থিং ব্যবস্থা, এলটি (LT) ওভারহেড লাইন, কম্পাউন্ড ও গার্ডেন লাইটিং, পিএবিএক্স (PABX) কাম ইন্টারকম ব্যবস্থা, এলটি ফিডার ক্যাবল, অন-গ্রিড সোলার সিস্টেম, ডিজিটাল সাইনবোর্ড, সিসি (CC) ক্যামেরা ব্যবস্থা, ডিজিটাল কনফারেন্স সিস্টেম এবং পিএ (পিএ/সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহ ও স্থাপন কাজটি সাবেক এক আওয়ামী মন্ত্রীর মেয়ে জামাইয়ের প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল-মদিনা এন্টারপ্রাইজকে চুৃক্তিমূল্য ৪২৭৭৯৯৬৭.১৯৬ টাকা চুক্তিমূল্যে পাইয়ে দেওয়া হয়। এই কাজে সিডিউল বহির্ভূতভাবে অত্যন্ত নি¤œমাণের যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপন দেখিয়ে বরাদ্দে পুরো অর্থ উঠিয়ে নেওয়ার পায়তারা করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আালম।
শুধু তাই নয়, স্বৈরাচারের দোসর ও আওয়ামী আমলে দেশব্যাপী একচেটিয়া কাজ করা বাবর এসাসিয়েটস্ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে ১১২৩৪৩৬ নং টেন্ডার আইডি ব্যবহার করে ১২৫৬০৭৯.৯২৮ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশাল জেলা জজ আদালত চত্বরে অবস্থিত ৪-তলা বিশিষ্ট জেলা জজ আদালত ভবনের প্লাস্টার ও ডিসটেম্পারের বিশেষ মেরামত কাজ ও ১১২৩৪৩৪ নং ওটিএম টেন্ডার আইডির মাধ্যমে একই প্রতিষ্ঠানকে ১১৪৭৯৬৩.৪৯১ টাকা চুক্তিমূল্যে বরিশাল জেলা জজ আদালত চত্বরে অবস্থিত ৪-তলা বিশিষ্ট জেলা জজ আদালত ভবনে সিলিকন পেইন্টসহ বিশেষ মেরামত কাজ দুটি পিপিআর বহির্ভূত ভাবে বিশেষ কৌশলে পাইয়ে দেওয়া হয়। এই কাজ দুটি সিডিউল বহির্ভূতভাবে অত্যন্ত নিমাণের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে এর বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে।
১১৫৩২৯৩ নং ওটিএম টেন্ডার আইডি ব্যবহার করে ২৭৯৩৫৫৫৪.৮২০ টাকা চুক্তিমূল্যে গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, রংপুর, জামালপুর এবং যশোর জেলায় BITAC-এর ৬ (ছয়) কেন্দ্র স্থাপন বরিশালে একটি (সাব হেড: ফায়ার ডিটেকশন অ্যান্ড প্রোটেকশন সিস্টেম) ব্যবস্থা সরবরাহ ও স্থাপন কাজটি বাবর এসোসিয়েটস্-এইএল জেভিকে পাইয়ে দেওয়া হয়। জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানী দুটিই ফ্যাসিবাদের দোসর বলে অভিযোগ রয়েছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরগুলোতেও প্রকৌশলী ফয়সাল আলম একইভাবে আ’লীগ ছাত্রলীগ যুবলীগ এর কথিত ঠিকাদারদের টেন্ডার পাইয়ে দিয়ে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আরো জানা যায়, আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সুবিধাভোগী ফয়সাল আলম সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নৌকার ব্যাজ বুকে লাগিয়ে সর্বত্র বিচরণ করতেন ওই সময়ে। নিজেকে তিনি জাহির করতেন মস্তবড় আ’লীগার। অভিযোগ উঠে-নিজে ছাত্রলীগ নেতার পরিচয় গোপণ করে স্বৈরাচারের শাসনামলের মতো দাপিয়ে বেড়াতে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পরও পদ পদবী ও আধিপত্য ধরে রাখতে বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। সে ধারাবাহিকতায় তিনি নিজেকে বিএনপি ঘরোনার ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নানা কায়দায় অপতৎপরতা চালিয়ে আসছেন। খোলস পাল্টিয়ে আওয়ামী জার্সি পরিত্যাগ করে তিনি ইতোমধ্যে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। অবৈধ অর্থের জোড়ে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) এর বরিশালে নবগঠিত কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান পদে আসীন হন বহুল বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বৈরাচারের শক্তিতে ক্ষমতাবান হয়ে তিনি একইসাথে বরিশাল ও ঝালকাঠি ডিভিশনের দায়িত্ব ধরে রাখেন প্রায় ৭ মাস। সে সময়ে অর্থ্যাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঝালকাঠি ডিভিশনে ভূয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে লোপাট করেন প্রায় কোটি টাকা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত টেন্ডার করেও ডিভিশনটিকে দেনায় ডুবিয়ে আসেন। নভেম্বর ২০২২ইং থেকে ২০২৪ জুন ফাইনাল পর্যন্ত ঝালকাঠির দায়িত্বে থেকে এই প্রকৌশলী এলটিএম টেন্ডারে ব্যাপক জালিয়াতি বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসার পাশাপাশি ঝালকাঠি সদর মডেল মসজিদ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ঝালকাঠি সদর হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ জেলা সমাজ সেবা কমপ্লেক্স এনএসআই ভবন পুলিশ লাইনে পুলিশ অফিসার্স মেস নির্মাণ কাজগুলোতে ব্যাপক জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। এ সকল বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে দুদকে অভিযোগ দেওয়া হলেও ফ্যাসিবাদের ক্ষমতায় তার কিছুই হয়নি। ফলে তিনি দুর্নীতি লুটপাটে তিনি আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন।
অনুসন্ধানী সূত্রগুলো বলছে, ৩২তম বিসিএস’র বহুল বিতর্কিত ফয়সাল আলমের গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শুক্তঘর এলাকায়। খুলনায় তিনি পড়ালেখা করেছেন। ছিলেন খুয়েট ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক। প্রভাবশালী আ’লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর অত্যন্ত আস্থাভাজন (পালিত ছেলে হিসাবে পরিচিত) হিসেবে ফয়সাল আলম ঝালকাঠিতে দীর্ঘদিন একই চেয়ার আঁকড়ে ধরে স্বৈরাচার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিজেকে বড় আ’লীগার হিসেবে জাহির করতেন তিনি। ঝালকাঠিতে আমুর প্রভাবে ব্যাপক দুর্নীতিতে জড়িয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের তোপের মুখে পড়েছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে ঝালকাঠির ঠিকাদাররা দুদকে অভিযোগও দিয়েছিলেন। দোর্দন্ড প্রভাবশালী আমুর আর্শিবাদপুষ্ট হওয়ায় কোনভাবেই তার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি সে সময়ে। ঝালকাঠি থেকে বরিশাল গণপূর্তে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠজন বনে গিয়ে নানা ধরণের অন্যায়-অনিয়মে জড়িয়ে পড়লেও তৎকালীন সময়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। উল্টো গোপণ সিন্ডিকেট তৈরী করে বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেন। প্রতিবাদীদের বিভিন্নভাবে নাজেহাল করেন তিনি। অভ্যুত্থানের পরেও তিনি ফ্যাসিবাদের লোকদের বেশীরভাগ কাজ পাইয়ে দিয়ে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং করছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গোপালগঞ্জের দীন ইসলামের এসএ এন্টারপ্রাইজকে কয়েক কেবাটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। ঢাকার বাবর এসোসিয়েটসকে বড় বড় অসংখ্য কাজ দিয়েছেন। স্থানীয় কেআইসি ট্রেডার্স, খান বিল্ডার্স, খান এন্টারপ্রাইজ, খান ট্রেডার্স, নয়ন এন্টারপ্রাইজ, আঞ্জুম ট্রেডার্স ও আবির এন্টারপ্রাইজসহ আরো ২/৩টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে সাথে নিয়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী লুটেরা সিন্ডিকেট তৈরী করেছেন তিনি।
আরো জানা যায়, শেবাচিম হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিট নির্মাণে ২দফা ব্যয় বাড়িয়ে বরাদ্দ হয় ২ শৎ ৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৯ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে বেজমেন্টসহ ১৫ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের গোপণ ব্যবসায়িক পার্টনার খান বিল্ডার্স নামক প্রতিষ্ঠানটি এ কাজের বাস্তবায়নে রয়েছে। ভবন নির্মাণ পুরোপুরি শেষ না হলেও ২০৩৪-২৪ অর্থবছরে ৪,৮৪,১০,৫০৮/-টাকা চুক্তিমূল্যে ওই ভবনের জন্য পিবিএক্স সিএটিভি/ডিস পিএ সিস্টেম ডিজিটাল কনফারেন্স সিস্টেম সোলার সিস্টেম পিএবিএক্স সিসিটিভি কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং গ্রীড সোলার সিস্টেম নার্স মনিটরিং সিস্টেম ডিঙ্কিং ওয়াটার পিউরিফায়ার সিস্টেম; একই অর্থবছরে ৫,৯৫,৮০,০০০/- টাকা চুক্তিমূল্যে মেডিকেল ওয়াস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম; ৫,৩৬,১৬,৪৭৪/- টাকা চুক্তিমূল্যে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি), ৫,৯৪,৪৩,৯৮০/- টাকা চুক্তিমূল্যে ডিস্ট্রিবিউশন লাইনসহ মেডিকেল গ্যাস সিস্টেম সরবারহ ও স্থাপণ; ৩,১৪,১৯,৫১৩/- টাকা চুক্তিমূল্যে ফায়ার ফাইটিং ম্যানেজমেন্ট সিষ্টেম সরবরাহ ও স্থাপন কাজ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০,৮৮,৯৮,৮৮৪/- টাকা চুক্তিমূল্যে ২টি ১৫০০ কেভি সাবস্টেশন এইচটি এলটি সার্ভিস ক্যাবল ৫০০ কেভি জেনারেটর ও পাম্প মোটর সেট সরবরাহ কাজগুলোতে মালামাল সরবরাহ দেখিয়ে ঠিকাদারদের পুরো বিল পরিশোধ করে প্রায় ২ কোটি টাকা লোপাট করেছেন প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। অথচ এ সকল মালামাল নির্দিষ্ট সাইটে স্থাপণের প্রয়োজনীয় জায়গার সংকুলান হয়নি এখনও। চাইনজ ব্র্যান্ডের নি¤œমাণের মালামাল সরবরাহ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে ডিভিশনটির প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে।
একইভাবে বরিশালে নভোথিয়েটার স্থাপণ প্রকল্পে ভবন নির্মাণের কাজ অর্ধেক শেষ না হলেও শূধুমাত্র কোটি টাকা লোপাটের উদ্দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬,২১,৭৭,৪৫২/- টাকা চুক্তিমূল্যে ফিডার ক্যাবলসহ ২০০০ কেভিএ সাবষ্টেশন ৪০০ কেভি জেনারেটর ৪০০ কেভি সাবস্টেশন ১৫০ কেভি জেনারেটর; ১১,৪৯,৯৯,০০০/- টাকা চুক্তিমূল্যে এসি সরবরাহ ও স্থাপন ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট কাজসহ পাম্প মোটর সেট পিএবিএক্স ও ইন্টারকম সিস্টেম সাউন্ড/পিএ কনফারেন্স সিসেস্টম অডিটোরিয়াম সাউন্ড সিসেবটম স্টেজ লাইট ও ভিডিও ওয়াল অডিটোরিয়াম স্টেজ কারটেইন সরবরাহ ও স্থাপণ কাজগুলোর সকল মালামাল সরবরাহ দেখিয়ে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নি¤œমাণের মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে এই ক্ষেত্রেও।
এছাড়াও ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বকয়েক কোটি টাকা বরাদ্দে দুর্গাসাগর ট্যুরিজম ফ্যাসালিটিজ প্রকল্প, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১,৪৭,৮২,৭৭০/- টাকা চুক্তিমূল্যে সার্কিট হাউজ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১,০৭,৯৫,০৩২/-টাকা চুক্তিমূল্যে জেলা প্রশাকের বাসভবনে বিভিন্ন ধরণের মেরামত পুণঃ বাসন কাজগুলোেেত ওভার ইষ্টিমেটের মাধ্যমে ৩/৪গুণ বেশী বরাদ্দ করিয়ে বেশীরভাগ অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্সের স্বত্তাধিকারী মিজান খান ওরফে কাশি মিজান এবং নাসির খান বিগত আ’লীগ সরকারের শাসনামলে সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ক্রেডিট কার্ড নামে পরিচিত পান। এরা বিগত স্বৈরাচারের শাসনামলে প্রকৌশলী ফয়সালের সহায়তায় একচেটিয়া গণপূর্তের কাজ ভাগিয়ে নিয়েছেন। ৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও বহুল বিতর্কিত এই দুই প্রতিষ্ঠান এখনও বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে অদৃশ্য শক্তিতে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। এক্ষেত্রে আওয়ামী ফ্যাসীবাদের সুবিধাভোগী দোসর হিসেবে আখ্যায়িত নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম এর সঙ্গে বিতর্কিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গভীর সখ্যতা বজায় রেখে তাদেরকে কাজ পাইয়ে দিয়ে আসছেন। ৫ আগস্টে পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে ফয়সাল আলমের বদলীর আদেশও হয়। স্বার্থ হাসিলের জন্য উক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দুটি নানা কলকাঠির মাধ্যমে ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় তার বদলীর আদেশ বাতিল করে স্বস্থানে বহাল রাখতে সক্ষম হন।
নির্ভরযোগ্য সুত্র জানায়, নিয়ম ভঙ্গ করে তিনি একচেটিয়েভাবে ঝালকাঠির বাসিন্দা নাসির খানের মালিকানাধীন খান বিল্ডার্স ও শহরতলীর কাশিপুরের বাসিন্দা মিজান খানের খান ট্রেডার্স নগরীর বড়-ছোট সকল ধরণের বাজেটের শত শত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। বরিশাল মেরিন একাডেমি, বঙ্গবন্ধু নভো থিয়েটার, ক্যান্সার হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক), শায়েস্তাবাদের তালতলী মডেল মসজিদ, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বরিশাল মেট্রােপলিটনের এয়ারপোর্ট থানা, আমানতগঞ্জে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রিপেয়ারিংয়ের কাজ সহ আরো অনেক কাজ প্রতিষ্ঠান দুটিকে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে পাইয়ে দিয়েছেন এবং দিযে আসছেন। এর মধ্যে মডেল মসজিদ ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে পরবর্তীতে তা ক্ষমতার দাপুটে শক্তিতে ধামাচাপা দেওয়া হয়। বিশেষ করে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের যোগশাজসে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে খান বিল্ডার্সকে ৯০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। পরবর্তীতে হাসপাতাল নির্মাণ কাজে আরো ৮০ কোটি ভাগিয়ে নেওয়ার কৌশলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি অর্থ বর্ধিতকরণের জন্য রিভাইস স্টিমেট দাখিল করে নানামুখী দৌঁড়ঝাপ চালিয়ে বরাদ্দ বাড়িয়ে নিয়েছেন।
আরো জানা যায়, দুটি উপজেলা মডেল মসজিদের (৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ইং) টেন্ডার ওপেনিংয়ের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে গণপূর্ত বিভাগ। তবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকার কারণে তিন মাস পর উক্ত টেন্ডার দুটি বাতিল করা হয়। বাতিলকৃত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- খান ট্রেডার্স, খান বিল্ডার্স, ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারী বাতিলকৃত দুটি মডেল মসজিদসহ আরো তিনটি মডেল মসজিদের ড্রপিংয়ের দিনক্ষণ ধার্য করে গণপূর্ত বিভাগ। এর পর গোপণ সমাঝোতার মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বাবর এ্যাসোসিয়েট ও খান ট্রেডার্স (জেবি) এবং এস.এ এন্টারপ্রাইজ ও খান বিল্ডার্স (জেবি)কে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য টেন্ডারের নিয়ম কানুন ভঙ্গ করে নানা ধরণের কুটকৌশল অবলম্বন করে তাদেরকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ ঠিকাদারদের প্রশ্ন- যে প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়ার্ক ক্যাপসিটি না থাকার কারণে এক মাস আগে টেন্ডার রিটেন্ডার করেছে সেই একই প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পূণরায় জেভির মাধ্যমে পরবর্তীতে একই টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে? প্রসঙ্গত : জেভির শর্তাবলীতে লিড পার্টনার ৪০%, সহযোগী পার্টনারস ২৫% টেন্ডারের শর্তবলীতে উল্লেখ থাকলেও সেই শর্তাবলী ভঙ্গ করে লিড পার্টনার ১০%, সহযোগী পার্টনার ৯০% এর কথা বলে নির্বাহী প্রকৌশলী তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য প্রকৌশলী ফয়সালের মোবাইলে বেশ কয়েকদিন একাধিকবার ফোন দিলেও তার রেসপন্স না পাওয়ায় মতামত গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। (ক্রমশঃ)